শীতকালের পিঠার নাম
পেজ সূচিপত্রঃ শীতকালের পিঠার নাম
- শীতকালের পিঠার নাম
- শীতের সকালে পিঠার মধুর গন্ধ বাংলার ঐতিহ্য স্বাদ
- পিঠার ইতিহাস শত শত বছর এর প্রাচীন একটি ঐতিহ্য
- পিঠার বিভিন্ন ধরন একই সুরে নানা সুর
- বানানোর প্রস্তুতিতে কি কি লাগবে?
- কিভাবে বানাবেন ভাপা পিঠা?
- পিঠা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারিতা
- পিঠার সামাজিক ও সংস্কৃতির গুরুত্ব
- অঞ্চলের বিশেষ পিঠা
- পিঠা সংরক্ষণের পদ্ধতি
- উপসংহারঃ শীতকালের পিঠার নাম
শীতকালের পিঠার নাম
শীতকালের পিঠার নাম সম্পর্কে জানুন,শীতকাল আসে বাংলার প্রকৃতিতে এক অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে। এই ঋতুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা রকম মুখরাচক পিঠার নাম ও স্বাদ। ভাপা পিঠা, পাটিসাপটা , পুলি পিঠা , চিতই পিঠা , দুধের পিঠা , গোকুল পিঠা , মুগ ডালের পিঠা , নামগুলো শুনলেই মনে পড়ে যায় শীতের সকালের রোদে বসে দাদু দাদির হাতে তৈরি পিঠা খাওয়ার স্মৃতি। প্রতিটি পিঠাতেই রয়েছে নিজস্ব গল্প ও ইতিহাস। ভাপা পিঠা যেমন মাটির সাকনিতে ভাব দিয়ে তৈরি হয়, তেমনি পাটিসাপটা তৈরি করতে প্রয়োজন বিশেষ দক্ষতার। চিতই পিঠা দেখতে জালির মত, আর দুধের পিঠা তৈরি হয় ঘন দুধের সিদ্ধ করে।
গোকুল পিঠার নাম শুনলে মনে পড়ে যায় কৃষ্ণ লীলার কথা, আর পুলি পিঠার আকৃতি মনে করিয়ে দেয় সেই ছোটবেলার কথা। মুগের ডালের পিঠা তার হালকা ও খাস্তা গুণের জন্য সকলের প্রিয়। এছাড়াও আছে নকশি পিঠা , রসমালাই , মালপোয়া , চন্দ্রপুলির মত আরো অনেক পিঠা , যেগুলো বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের সংস্কৃতির সাথে খুবই জনপ্রিয়ভাবে মিশে আছে। শীতের সকালে গরম গরম ভাপা পিঠা কিংবা রোদে শুকানো চিতাই পিঠা বাঙালির হৃদয়ে গেতে আছে মিষ্টি স্মৃতি হিসাবে । এই পিঠাগুলো কেবল মুখের সাথেই মেটায় না, বরং আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বহন করে নিয়ে চলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।
শীতের সকালে পিঠার মধুর গন্ধ বাংলার ঐতিহ্য স্বাদ
শীতের সকালে বাংলার গ্রামীণ জীবনের সবচেয়ে মধুর অনুভূতি গুলোর মধ্যে একটি হল পিঠার গন্ধে ঘর ভরে ওঠা। সকাল সকাল উঠে যখন রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে নতুন চালের গোড়া আর খেজুর গুড়ের সুবাস তখন মনে হয় শীতেই যেন বাংলার সবচেয়ে রসালো ঋতু। এই গন্ধ শুধু নাকেই লাগেনা, এটি স্মৃতি কাতর করে তোলে। মনে পড়ে যায় ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা যখন দাদুর হাতে গড়া ভাপা পিঠা খেতে খেতে শীতের রোদে বসে থাকা হতো। পিঠা কেবল একটি খাবার নয়, এটা আমাদের সংস্কৃতির জীবন্ত অংশ। প্রতিটি পিঠার পিছনে লুকিয়ে আছে ইতিহাস আছে গল্প।
ভাপা পিঠা , পাটিসাপটা , চিতই পিঠা , দুধের পিঠা নামগুলো শুনলে চোখের সামনে ভেসে উঠে শীতের সকালের উৎসবের ছবি। এই পিঠা তৈরি হওয়ার দৃশ্য নিজেই একটি শিল্পকর্ম চালের গুড়া মাখা , গুড়ের শরবত তৈরি করা , নারকেল কুড়ানো আর শেষে সব মিলে পিঠা খাওয়া। শহরের জীবনে ব্যস্ততার মধ্যে ও শীত এলে বাংলার মানুষ পিঠার স্বাদ ভোলে না। অনেকেই এই সময় বাড়িতে ছোট আকারের হোক পিঠা বানানোর আয়োজন করেন। কারন আমরা জানি পিঠা হচ্ছে আমাদের ঐতিহ্য আমাদের আবেগের পথিক। শীতের পিঠা তাই শুধু পেট ভরায় না, এটি হৃদয়ও ভরায়।পিঠার ইতিহাস শত শত বছর এর প্রাচীন একটি ঐতিহ্য
পিঠার ইতিহাস বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। শত শত বছর ধরে বাঙালির জীবনযাত্রার সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী খাবারটি মিশে আছে। প্রাচীন বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজে নতুন ফসল ঘরে তোলার উৎসব হিসেবে পিঠা তৈরির সূচনা হয়েছিল। তখনকার সময়ে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত নতুন চাল দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরি করতেন, যা ছিল তাদের আনন্দ ও সমৃদ্ধির প্রকাশ। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে পিঠার উল্লেখ পাওয়া যায়, বিশেষ করে চণ্ডীদাস এবং বিদ্যাপতির রচনায়। তখনকার সময়ে জমিদার ও রাজপরিবারগুলোতে পিঠা উৎসব আয়োজন করা হতো। ব্রিটিশ আমলেও এই ঐতিহ্য বজায় ছিল, তবে তখন কিছুটা পরিবর্তন আসে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে পিঠা তার ঐতিহ্যবাহী রূপ ধরে রাখলেও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। বর্তমানে পিঠা কেবল গ্রামীণ সমাজেই সীমাবদ্ধ নেই, শহুরে জীবনেও এটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। বিভিন্ন রেস্তোরাঁ এবং হোটেলে এখন ঐতিহ্যবাহী পিঠা পরিবেশন করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পিঠা উৎসবের মাধ্যমে এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। পিঠার ইতিহাস শুধু একটি খাবারের ইতিহাস নয়, এটি বাঙালির সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক ইতিহাসেরও অংশ। প্রতিটি যুগে পিঠা তার রূপ ও স্বাদে কিছু না কিছু পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু তার মৌলিকতা কখনো হারায়নি। আজও দাদি-নানিদের হাতের সেই ঐতিহ্যবাহী পিঠার স্বাদ আমাদের মুখে জল আনে, যা প্রমাণ করে এই ইতিহাস এখনও জীবন্ত।
পিঠার বিভিন্ন ধরন একই সুরে নানা সুর
পিঠার জগৎটি যেমন বিস্ময়কর, তেমনই রহস্যময়। ভাবতে অবাক লাগে, একই চালের গুঁড়ো আর গুড় দিয়ে কীভাবে এত রকমের পিঠা তৈরি সম্ভব! প্রতিটি পিঠাই যেন এক একটি কাব্যিক সৃষ্টি, যার নিজস্ব গঠন, স্বাদ এবং প্রস্তুতপ্রণালি রয়েছে। সহজ ভাপা পিঠা থেকে শুরু করে জটিল নকশি পিঠা প্রতিটিরই আলাদা কাহিনী আছে। ভাপা পিঠা যেমন মাটির সানকিতে ভাপ দিয়ে তৈরি হয়, তেমনি পাটিসাপটা প্রয়োজন বিশেষ দক্ষতা, যেখানে পাতলা করে বেলানো মণ্ডের মধ্যে নারিকেল-গুড়ের ভরা দিয়ে শিল্পীর মতো রোল তৈরি করতে হয়। চিতই পিঠার কথা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে জালির মতো সুন্দর গঠন, যা একটি বিশেষ ছাঁচ দিয়ে তৈরি করা হয়।
আর দুধের পিঠা তো এক কথায় অনবদ্য ছোট ছোট পিঠা ঘন দুধে সিদ্ধ হয়ে যে স্বর্গীয় স্বাদ তৈরি করে, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। গোকুল পিঠা নামটি শুনলেই মনে পড়ে যায় কৃষ্ণের গোকুলের কথা, আর পুলি পিঠার অর্ধচন্দ্রাকার রূপ দেখলে মনে হয় যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো চিত্র। মুগ ডালের পিঠা তার হালকা ও খাস্তা গুণের জন্য সকলের প্রিয়, আবার নকশি পিঠা তার নান্দনিক ডিজাইনের জন্য শিল্পের মর্যাদা পেয়েছে। প্রতিটি অঞ্চলের বিশেষ পিঠা রংপুরের নকশি পিঠা, সিলেটের রশ মালাই, বরিশালের চন্দ্রপুলি সবাই মিলে তৈরি করেছে বাংলার পিঠার এই অপার বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্যই তো বাংলার পিঠাকে করেছে অনন্য, করেছে বিশ্বের অন্যান্য ঐতিহ্যগত খাবারের থেকে আলাদা।
বানানোর প্রস্তুতিতে কি কি লাগবে?
পিঠা বানানোর প্রস্তুতি একটি আনন্দদায়ক ও শৈল্পিক প্রক্রিয়া, যেখানে উপকরণ নির্বাচন থেকে শুরু করে সরঞ্জাম সংগ্রহ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই থাকে বিশেষ যত্নের প্রয়োজন। প্রধান উপকরণ হিসেবে প্রথমেই প্রয়োজন ভালো মানের চালের গুঁড়ো, যা সাধারণত গোবিন্দভোগ বা কাঁচা চাল দিয়ে তৈরি করা হয়। চালকে থেতলে নয়, বরং ভিজিয়ে শুকিয়ে গুঁড়ো করতে হয় যাতে পিঠা নরম ও হালকা থাকে। দ্বিতীয় অপরিহার্যউপকরণ হলো খেজুরের গুড়, যা পিঠাকে এক অনন্য মিষ্টতা ও সুবাসদান করে। গুড়টি যেন তাজা ও ভালো মানের হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তৃতীয় উপকরণ হলো তাজা নারিকেল, যা কুরে নিয়ে এর সাথে গুড় মিশিয়ে আছে।
একটি ভরা বা অনুভূতি তৈরি করা হয়। এছাড়াও প্রয়োজন হয় পরিমিত পানি, যা দিয়ে চালের গুঁড়োর মণ্ড প্রস্তুত করতে হবে না বেশি ঘন, না বেশি তরল। কিছু বিশেষ পিঠার জন্য প্রয়োজন হতে পারে দুধ, ছানা, মাওয়া বা বিভিন্ন ধরনের ডাল। সরঞ্জামের মধ্যে হলো একটি ননস্টিক কড়াই বা মাটির সানকি, যাতে পিঠা লেগে না যায়। এছাড়াও প্রয়োজন হবে বাঁশের বা স্টিলের স্টিমার,বিভিন্ন আকারের ছাঁচ, এবং মণ্ড বেলার জন্য পরিষ্কার একটি প্লাটফর্ম। মনে রাখতে হবে, উপকরণের ধরন নির্ধারণ করে পিঠার স্বাদ ও গঠন। তাই তাজা ও উন্নত মানের উপকরণ নির্বাচন করা সফল। প্রস্তুতির এই ধাপগুলোতে একটু বেশি সময় নিলে ফলাফল হয় সত্যিই পুরস্কৃত।
আরো পড়ুনঃ রুটি খাওয়ার উপকারিতা অপকারিতা
কিভাবে বানাবেন ভাপা পিঠা?
ভাপা পিঠা বানানোর প্রক্রিয়াটি এক অপূর্ব শিল্পকলার মতো, যেখানে ধৈর্য্য ও দক্ষতার সমন্বয় প্রয়োজন। প্রথমেই একটি গভীর পাত্রে ভালো মানের চালের গুঁড়ো নিতে হবে, তার সাথে অল্প একচিমটি লবণ যোগ করে হাত দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। এবার অল্প অল্প করে পানি যোগ করতে থাকুন এবং হাতের তালু দিয়ে মণ্ড এমনভাবে মাখুন যাতে কোনো গুঁড়া না থাকে, কিন্তু মণ্ড যেন বেশি নরমও না হয়। সঠিক কনসিসটেন্সি হলো যখন মণ্ড হাত থেকে সহজে আলাদা হয় কিন্তু চাপ দিলে সুন্দরভাবে আকৃতি ধারণ করে। এবার আলাদা একটি বাটিতে তাজা কোরানো নারিকেল ও ভাঙা খেজুরের গুড় মিশিয়ে মিষ্টি ভরা তৈরি করুন। এখন একটি ছোট বলের মতো মণ্ড নিয়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে মাঝে একটি গর্ত তৈরি করুন,যেন নিচে ফুটো না হয়।
এই গর্তে এক চা-চামচ নারিকেল-গুড়ের ভরা দিয়ে উপরের দিকটা সুন্দরভাবে বন্ধ করে দিন। এবার একটি কড়াইয়ে পানি দিয়ে ফুটতে দিন এবং তার উপর বাঁশের বা স্টিলের স্টিমার বসান। স্টিমারের তলায় হালকা করে তেল মাখিয়ে নিন যাতে পিঠা লেগে না যায়। প্রস্তুত কাঁচা পিঠাগুলো স্টিমারে কিছুটা ফাঁকা রেখে সাজান। মাঝারি আঁচে ১০-১২ মিনিট ঢাকনা দিয়ে ভালোভাবে বাষ্প দিন। যখন পিঠাগুলো ফুলে উঠে এবং চকচকে দেখাবে, তখনই বুঝবেন যে ভাপা পিঠা তৈরি হয়েছে। স্টিমারটি নামিয়ে একটু ঠাণ্ডা হতে দিন, তারপর গরম গরম পরিবেশন করুন। মনে রাখবেন, ভাপা পিঠা যত তাজা অবস্থায় খাওয়া যায়, তার স্বাদ ততই উন্নত হয়। এই সহজ পদ্ধতিতে আপনি বাড়িতেই তৈরি করতে পারবেন ঐতিহ্যবাহী বাংলার সাদ।
পিঠা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারিতা
পিঠা যে কেবল মুখরোচক একটি খাবার তা নয়, বরং এটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যও বেশ উপকারী যখন পরিমিতভাবে গ্রহণ করা হয়। আসুন জেনে নিই পিঠার কিছু উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য উপকারিতা। প্রথমত, চালের গুঁড়ো থেকে আমরা পাই কার্বোহাইড্রেট যা আমাদের শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে, বিশেষ করে শীতকালে যখন শরীরে অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন পড়ে। দ্বিতীয়ত,খেজুরের গুড় আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাসিয়ামের একটি চমৎকার উৎস, যা রক্তস্বল্পতা দূর করতে ও হাড়ের স্বাস্থ্য উন্নত করতে সহায়ক। তৃতীয়ত, নারিকেলের মধ্যে থাকা স্বাস্থ্যকর স্নেহপদার্থ হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী এবং এটি শরীরে ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে।
চতুর্থত, বাড়িতে তৈরি পিঠায় কোনোরকম ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভ বা কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয় না, ফলে এটি বাজারের অন্যান্য মিষ্টান্নের তুলনায় বেশি নিরাপদ। পঞ্চমত, বিভিন্ন ধরনের পিঠায় বিভিন্ন পুষ্টিগুণ বিদ্যমান - যেমন দুধের পিঠায় থাকে ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন যা হাড় ও মাংসপেশির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, আবার মুগ ডালের পিঠায় থাকে প্রোটিন ও ফাইবার যা হজমে সাহায্য করে। তবে মনে রাখতে হবে, পিঠায় ক্যালোরির মাত্রা তাই ডায়াবেটিস বা ওজন নিয়ন্ত্রণের সমস্যা থাকলে পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করা উচিত। সঠিক উপকরণ ও পরিমাণ মেনে তৈরি পিঠা যখন সুষম খাদ্য এর অংশ হিসেবে খাওয়া হয়, তখন তা থেকে আমরা পেতে পারি নানাবিধ স্বাস্থ্য উপকারিতা ।
পিঠার সামাজিক ও সংস্কৃতির গুরুত্ব
পিঠা বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তার অবস্থান মজবুত করে আসছে। গ্রামবাংলার সমাজব্যবস্থায় পিঠা কেবল একটি খাদ্যবিশেষ নয়, বরং এটি সম্প্রীতির মধুর সেতুবন্ধন। শীতকালীন পিঠা উৎসবের মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধন যেমন সুদৃঢ় হয়, তেমনি প্রতিবেশীদের মধ্যে আন্তরিকতার বিনিময় ঘটে। যখন একটি পরিবারে পিঠা তৈরি শুরু হয়, তখন পার্শ্ববর্তী বাড়িগুলোতে পিঠা বিতরণের যে রীতি চালু থাকে, তা সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় অনন্য ভূমিকা পালন করে। সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে, পিঠা আমাদের লোকজ শিল্পকলারই একটি রূপ।
নকশি পিঠার নিখুঁত ডিজাইন কিংবা পাটিসাপটা বানানোর শিল্পসুষমা-সবই বাংলার শিল্পীসত্তার প্রকাশ। বিভিন্ন উৎসব-পার্বনে পিঠার উপস্থিতি আমাদের সংস্কৃতিকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। পৌষ সংক্রান্তি, নবান্ন বিবাহ অনুষ্ঠানের মতো সামাজিক এ পিঠার ব্যবহার আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটায়। শহুরে জীবনযাপনের প্রভাবে যখন আমাদের অনেক প্রাচীন প্রথা বিলুপ্তির পথে, তখনও পিঠার প্রচলন অব্যাহত থাকা আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার অমলিনতা। নতুন প্রজন্মের মধ্যে পিঠার জনপ্রিয়তা আমাদের এর ধারাবাহিকতারই পরিচয় দেয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, পিঠা কেবল আমাদের পেটই ভরায় না,আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কেও সমৃদ্ধ করে।
অঞ্চলের বিশেষ পিঠা
বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের বিশেষ পিঠাগুলো যেন স্থানীয় সংস্কৃতি ও স্বাদের জীবন্ত দলিল। রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলের নকশি পিঠা সত্যিই এক অনন্য শিল্পকর্ম। কাঠের তৈরি নকশাখচিত ছাঁচে ফেলে এই পিঠাগুলোতে তোলা হয় ফুল, পাতা ও জ্যামিতিক নকশা, যা শুধু খাবারই নয়, দৃষ্টিনন্দন শিল্পবস্তুও বটে। সিলেট অঞ্চলের রশ মালাই বা জালি পিঠা তার স্বতন্ত্র গঠন ও প্রস্তুতপ্রণালির জন্য বিখ্যাত। চালের গুঁড়োর তরল মণ্ড বিশেষ পদ্ধতিতে প্রস্তুত করে এটিকে নুডলসের মতো সরু আকার দেয়া হয়, যা পরে দুধ ও চিনির সরবতে ভেজে এক অতুলনীয় স্বাদ সৃষ্টি করে।
বরিশালের চন্দ্রপুলি পিঠা তার নামের মতোই চন্দ্রকলার আকৃতি ধারণ করে, যার ভর্তায় থাকে নারিকেল ও খেজুরের গুড়ের মনমুগ্ধকর সমন্বয়। কুষ্টিয়া ও যশোর অঞ্চলে মুগ ডালের পিঠার জনপ্রিয়তা অনেক বেশি, যার হালকা ও খাস্তা গুণ এটিকে সকলের প্রিয় করে তুলেছে। নদীয়া ও বর্ধমান অঞ্চলের সরভাজা পিঠা ছানাকে ঘিয়ে ভেজে চিনির সিরায় ডুবিয়ে তৈরি করা হয়, যা এক কথায় মাখানো স্বাদের। খুলনা অঞ্চলের পাকান পিঠা তার দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য গুণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। প্রতিটি অঞ্চলেরই পিঠা সেই এলাকার ভৌগলিক অবস্থান, কৃষিপণ্য ও স্থানীয় রুচির অনন্য পরিচয় বহন করে। এই বৈচিত্র্যই বাংলার পিঠার জগৎকে করেছে আরও সমৃদ্ধ ও বর্ণাঢ্য।
পিঠা সংরক্ষণের পদ্ধতি
পিঠা সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ বেশিরভাগ পিঠাই তাজা অবস্থায় খেতে ভালো লাগে। তবে সঠিক নিয়মে সংরক্ষণ করলে কিছু পিঠা বেশ কিছুদিন পর্যন্ত ভালো রাখা সম্ভব। শুকনো পিঠা যেমন চিতই পিঠা, মুগ ডালের পিঠা বা নকশি পিঠা সংরক্ষণ করা সবচেয়ে সহজ। এগুলো পুরোপুরি ঠাণ্ডা করে এয়ারটাইট কন্টেইনারে রেখে দিলে প্রায় এক মাস পর্যন্ত ভালো থাকে। সংরক্ষণের আগে পিঠাগুলো সম্পূর্ণ শুকিয়ে নিতে হবে তেল বা নমি থাকলে পিঠা দ্রুত নষ্ট হয়ে যাবে। নরম পিঠা যেমন ভাপা পিঠা বা দুধের পিঠা সাধারণত ২-৩ দিনের বেশি রাখা যায় না। এগুলো ফ্রিজে রাখলে একটু বেশি সময় ভালো থাকে, কিন্তু স্বাদ ও নরমভাব কিছুটা কমে যায়।
ফ্রিজে রাখার সময় পিঠাগুলোকে এয়ারটাইট পাত্রে বা ক্লিং ফিল্ম দিয়ে ভালোভাবে মুড়ে রাখতে হবে, যাতে বাইরের গন্ধ শোষণ না করে। কিছু পিঠা ফ্রিজারেধরে সংরক্ষণ করা যায়, যেমন গোকুল পিঠা বা ছানার পিঠা। ফ্রিজারে রাখার আগে পিঠাগুলো পুরোপুরি ঠাণ্ডা করে আলাদা আলাদা করে ক্লিং ফিল্মে প্যাঁচিয়ে নিলে সেগুলো আরও ভালো থাকে। যখন খাওয়ার ইচ্ছা হবে, তখন সরাসরি ফ্রিজার থেকে বের করে না নিয়ে প্রথমে ফ্রিজের নরমাল কম্পার্টমেন্টে কয়েক ঘণ্টা রাখতে হবে। পরে হালকা গরম ভাপে বা মাইক্রোওয়েভে গরম করলে পিঠা তার তাজা ভাব ফিরে পায়। তবে মনে রাখা জরুরি, সংরক্ষিত পিঠার স্বাদ কখনোই তাজা পিঠার মতো হয় না, তাই যতটা সম্ভব তাজা অবস্থায় পিঠা খাওইয়াই।
আরো পড়ুনঃ রুটি খাওয়ার উপকারিতা অপকারিতা
উপসংহারঃ শীতকালের পিঠার নাম
শীতকালের পিঠার নাম,শীতকালীন পিঠার নাম শুনলেই মনে হয় যেন বাংলার গ্রাম্য জীবনের এক অপূর্ব ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ভাপা পিঠা ,পাটিসাপটা্চিতই পিঠা ,দুধের পিঠা্গুগুল পিঠা ,পুলি পিঠা্এই নামগুলো প্রতিটি শুধু একটি খাবারের পরিচয় দেয় না ,বরং আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল হয়ে আছে। প্রতিটি নামের পিছনে লুকিয়ে আছে ইতিহাস আছে গল্প আছে বাঙালির হৃদয়ের সম্পর্ক যখন আমরা এই নাম গুলো উচ্চারণ করি ।তখন শুধু মুখে জলি আসে না মনে পড়ে যায় দাদু দিদার বাড়ির আঙ্গিনায় পিঠা বানানোর উৎসব মুখর দিনগুলোর কথা । এই নামগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলার শীতল সকালের কুয়াশা ভেজা রোদ মনে করিয়ে,দেয়।
বাড়ির উঠোনে বসে পিঠা বানানোর মজা আর মনে করিয়ে দেয় প্রতিবেশীদের মধ্য পিঠা বিতরণের সেই মধুর রীতি। শীতকালীন পিঠার নাম গুলো তাই শুধু খাবারের তালিকায় নয় এগুলো আমাদের মেমোরিতে অমূল্য সম্পদ ।এই নামগুলো যেন বাংলার ঋতুচক্রের একটি ঋতু যেখানে নামমি আমাদের সঙ্গে কথা বলে ।আমাদের পূর্বপুরুষদের কথা এই নাম গুলোর মধ্যেই আমরা আমাদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখেছি। আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য বহন করে নিয়ে যাচ্ছি শীতকালীন পিঠার এই নামগুলো তাই চিরকাল বাঙ্গালীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়ে থাকবে। আমারে আর্টিকেলটি সম্পন্ন করার জন্য ধন্যবাদ আর বুঝতে কোন সমস্যা হলে কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করবেন ধন্যবাদ।


সফটনড়িতে নীতিমালা ; মেনে ;কমেন্ট করুন ;প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়;
comment url