শিশুদের মোবাইল আসক্তির কুফল
শিশুদের মোবাইল আসক্তির কুফল, শিশুদের মোবাইল আসক্তির ভয়াবহ কপাল সম্পর্কে জানুন। এই আর্টিকেলখুব সহজ ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে।
কিভাবে মোবাইল শিশুর শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ,সামাজিক দক্ষতা ও পড়াশোনার ক্ষতি করেছে। জেনে নিন প্রতিকার ও সমাধানের কার্যকারী উপায়। শিশুদের মোবাইল আসক্তির কুফল,পুরোটা জানতে আর্টিকেলটির সম্পূর্ণ পড়ুন।পেজ সূচিপত্রঃ শিশুদের মোবাইল আসক্তির কুফল
- শিশুদের মোবাইল আসক্তির কুফল
- শিশুর শারীরিক বিকাশে বাধা ও নানান রোগের সৃষ্টি
- মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি এবং উদ্বেগ বিষন্নতা বাড়ায়
- পড়াশোনায় অমনোযোগী ও ফলাফল খারাপ হওয়া
- সামাজিক দক্ষতা কমে যাওয়া এবং একা থাকার প্রবণতা
- পরিবারের বন্ধন শিথিল হওয়া ও সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ায়
- আচরণগত সমস্যা জেদ বাড়াই
- ভাষা বিকাশে বাধা এবং নতুন শব্দ শেখা কমে যায়
- অনাকাঙ্ক্ষিত কনটেন্ট প্রবেশ ও বিপদজনক জগতে পৌঁছানো
- শেষ কথাঃ শিশুদের মোবাইল আসক্তির কুফল-সমাধানের পথ ও মুক্তির উপায়
শিশুদের মোবাইল আসক্তির কুফল
শিশুদের মোবাইল আসক্তির কুফল,নিঃসন্দেহে প্রযুক্তির এই যুগে মোবাইল ফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য উপকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু যখনই এটি শিশুদের হাতে অতিরিক্ত সময়ের জন্য তুলে দেওয়া হয়, তখনই এটি এক ভয়াবহ আসক্তির রূপ নেয়। শিশুদের মোবাইল আসক্তি কেবল তাদের বর্তমান জীবনই নয়, ভবিষ্যতের সমূহ সম্ভাবনাকেও ধ্বংস করার মতো ক্ষতি করে। এই প্রবন্ধে আমরা শিশুদের মোবাইল আসক্তির বিভিন্ন কুফল নিয়ে সহজ ও বোধগম্য ভাষায় আলোচনা করব।শারীরিক বিকাশে বাধা হচ্ছে মোবাইল আসক্তির প্রথম ও প্রধান কুফল। দীর্ঘ সময় ধরে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে শিশুর দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
অনেক শিশুর অল্প বয়সেই চশমা ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দেয়। এছাড়াও মোবাইলের নীল আলো শিশুর ঘুমের চক্রে ব্যাঘাত ঘটায়, যা থেকে সৃষ্টি হয় অনিদ্রা ও ক্লান্তির সমস্যা। ঘাড় ও মেরুদণ্ডের বেঠিক ভঙ্গিতে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের ফলে অনেক শিশুই আজকাল পিঠব্যথা ও ঘাড়ব্যথার সমস্যায় ভুগছে।মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে আরেকটি গুরুতর সমস্যা। মোবাইলের ভার্চুয়াল জগতে অতিরিক্ত সময় কাটানোর ফলে শিশুরা বাস্তব জগত থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।তারা মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। এই অবস্থা থেকে জন্ম নিচ্ছে নানা রকম মনোবিজ্ঞান সমস্যা - যেমন উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, খিটখিটে মেজাজ।
অনেক শিশুই মোবাইল ছাড়া থাকতে পারছে না, যা একপ্রকার নেশায় পরিণত হয়েছে।শিক্ষা ও মানসিক বিকাশে বাধা এই আসক্তির আরেকটি ভয়াবহ দিক। মোবাইলের দ্রুতগতি বিনোদনের সাথে তাল মিলিয়ে পড়াশোনার ধীরগতি কার্যক্রমে শিশুরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। তাদের মনোযোগ ও ধৈর্য দুইই কমে যাচ্ছে। বই পড়া, গান শেখা, ছবি আঁকার মতো সৃজনশীল কাজে তাদের আগ্রহ কমে গিয়ে শুধু মোবাইল নিয়েই ব্যস্ত থাকতে চায়। এতে করে তাদের সৃজনশীলতা ও মৌলিক চিন্তা করার ক্ষমতা দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা হচ্ছে আরেকটি বড় সমস্যা।মোবাইলে বুঁদ হয়ে থাকার ফলে শিশুরা পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটাতে চায় না।
পারিবারিক আড্ডা, বেড়ানো, খেলাধুলায় তাদের অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে। এতে করে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। একইভাবে বন্ধুদের সাথেও তাদের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা সামাজিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না, যা ভবিষ্যৎ জীবনে তাদের জন্য বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করবে।এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সচেতন হতে হবে। শিশুদের মোবাইল ব্যবহারের সময় সীমিত করতে হবে, তাদের জন্য বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে,বইপড়া,খেলাধুলা এবং সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করতে হবে। পরিবারের সদস্যরা যদি নিজেরাও মোবাইল থেকে সময় বের করে শিশুদের সাথে গুণমান সময় কাটান,তাহলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। মনে রাখতে হবে, শিশুর সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আমাদের আজকেই সচেতন হতে হবে।
শিশুর শারীরিক বিকাশে বাধা ও নানান রোগের সৃষ্টি
বাংলাদেশে শিশুদের মোবাইল আসক্তি একটি উদ্বেগজনক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল ফোন ব্যবহার শিশুদের শারীরিক বিকাশে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করছে। এই প্রবন্ধে আমরা শিশুদের মোবাইল আসক্তির শারীরিক কুফলগুলো নিয়ে আলোচনা করব।মোবাইল ফোনের অত্যধিক ব্যবহার শিশুদের দৃষ্টিশক্তির উপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো শিশুর চোখের রেটিনাকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অনেক শিশুই এখন চোখে ব্যথা, ঝাপসা দেখা এবং শুষ্ক চোখের সমস্যায় ভুগছে। চিকিৎসকরা লক্ষ্য করছেন যে আগে যেখানে কিশোর বয়সে শিশুরা চশমা ব্যবহার করত, এখন অল্প বয়সী শিশুরাও চশমা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।
শিশুর ঘাড় ও মেরুদণ্ডের গঠনেও এই আসক্তি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘক্ষণ নিচু হয়ে মোবাইল ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে 'টেক্সট নেক' সিনড্রোম দেখা দিচ্ছে। এই সমস্যায় ঘাড়ে ব্যথা, মাথাব্যথা এবং কাঁধে টান পড়ছে। অনেক শিশুর মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বক্রতা পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে স্থায়ী পিঠের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।মোবাইল আসক্তি শিশুর ঘুমের ধরণকেও বিঘ্নিত করছে। স্ক্রিনের নীল আলো মেলাটোনিন হরমোন উৎপাদন কমিয়ে দেয়, যা শিশুর ঘুম আসতে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে শিশু রাতে ঠিক মতো ঘুমাতে পারে না এবং সারাদিন ক্লান্তি ও অবসন্নতা নিয়ে চলাফেরা করে। এই অনিদ্রা শিশুর বৃদ্ধি হরমোনের কার্যকারিতাকেও বিঘ্নিত করে, যা তার স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে।শিশুর মোটর দক্ষতা বিকাশেও এই আসক্তি বাধা সৃষ্টি করছে।
মোবাইল ব্যবহারে শিশুর শুধু আঙুলের সূক্ষ্ম নড়াচড়া হয়, কিন্তু বড় পেশাগুলোর কার্যক্রম কমে যায়। ফলে শিশুর হাঁটা, দৌড়ানো, লাফানো এবং অন্যান্য শারীরিক কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ছে। এই অবস্থা শিশুর সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে এবং স্থূলতা বৃদ্ধিতে অবদান করছে।মোবাইল আসক্তি শিশুর শ্রবণশক্তিকেও প্রভাবিত করছে। অনেক শিশুই উচ্চ শব্দে হেডফোন ব্যবহার করছে, যা তাদের কানের জন্য ক্ষতিকর। এভাবে দীর্ঘক্ষণ উচ্চ শব্দে অডিও শুনলে শিশুর শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশেও মোবাইল আসক্তি প্রভাব ফেলছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ব্যবহার শিশুর স্নায়ুবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এটি শিশুর স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং শেখার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও এই আসক্তির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু থাকে, যা শিশুকে সহজেই রোগাক্রান্ত করতে পারে। আর দীর্ঘক্ষণ অন্দর থাকার কারণে শিশু পর্যাপ্ত সূর্যালোক থেকে বঞ্চিত হয়, ফলে ভিটামিন ডি-এর অভাব দেখা দেয়।শিশুর খাদ্যাভ্যাসেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মোবাইল ব্যবহার করতে গিয়ে অনেক শিশুই ঠিক মতো খাবার খায় না বা বেশি জাঙ্ক ফুড খায়। এই অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শিশুর পুষ্টির অভাব এবং হজম সংক্রান্ত সমস্যা সৃষ্টি করছে।উপরিউক্ত সমস্যাগুলো থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের সচেতন হতে হবে। শিশুদের মোবাইল ব্যবহার সীমিত করতে হবে, তাদের শারীরিক কার্যকলাপ-তে উৎসাহিত করতে হবে এবং পর্যাপ্ত বহিরঙ্গ খেলাধুলার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুর সুস্থ শারীরিক বিকাশ নিশ্চিত করতে আমাদের আজই পদক্ষেপ নিতে হবে।
আরো পড়ুনঃ ঝাপসা ছবি কিভাবে স্পষ্ট করা যায়
মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি এবং উদ্বেগ বিষন্নতা বাড়ায়
আজকের ডিজিটাল যুগে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হচ্ছি মোবাইল আসক্তির প্রভাবে। এই ছোট্ট ডিভাইসটি শিশুর মনোজগতে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, তার পরিণাম ভয়াবহ। শিশুরা যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলের স্ক্রিনে আটকে থাকে, তখন তাদের মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।মোবাইল আসক্তি শিশুদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক নির্ভরশীলতা তৈরি করে। তারা বাস্তব জগতের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতকেই বেশি বাস্তব মনে করতে শুরু করে। এই অবস্থা শিশুদের সামাজিক মেলামেশা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধা দেয়। তারা ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নেয়, একা থাকতে পছন্দ করে এবং মানুষের সাথে মিশতে ভয় পায়।
এই বিচ্ছিন্নতা তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষন্নতা তৈরি করতে শুরু করে।অনেক সময় শিশুরা সোশ্যাল মিডিয়া এবং অনলাইন গেমসে এমন একটি জগতে বাস করতে শুরু করে, যা পুরোপুরি অবাস্তব। তারা সেখানে নিখুঁত জীবন, নিখুঁত চেহারা এবং নিখুঁত সাফল্য দেখে। যখন বাস্তব জীবনটা তার চেয়ে ভিন্ন হয়, তখন তারা হতাশায় ভোগে। নিজেদের অক্ষম এবং অযোগ্য মনে করতে শুরু করে। এই হতাশা ধীরে ধীরে গভীর বিষন্নতায় রূপ নেয়।মোবাইলের মাধ্যমে শিশুরা এমন অনেক বিষয়ের সম্মুখীন হয়, যা তাদের বয়সের জন্য উপযুক্ত নয়। ভয়ঙ্কর গেমস, হিংসাত্মক ভিডিও এবং অপ্রয়োজনীয় চাপ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তারা রাতে ঠিক মতো ঘুমাতে পারে না, দুঃস্বপ্ন দেখে এবং অনিদ্রায় ভোগে। এই সমস্যাগুলো তাদের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।মোবাইল আসক্তি শিশুদের মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যেও পরিবর্তন আনে। ডোপামিন নামক রাসায়নিকের নিঃসরণের মাধ্যমে মোবাইল ব্যবহারের সময় তারা আনন্দ পায়, কিন্তু এই আনন্দ খুবই ক্ষণস্থায়ী। যখন মোবাইল থেকে দূরে থাকে, তখন তারা খিটখিটে ও বিরক্তিকর আচরণ করে। এই অবস্থাকে বিজ্ঞানীরা বলেন 'ডিজিটাল উইথড্রয়াল'।শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাবও দেখা দিচ্ছে মোবাইল আসক্তির কারণে। তারা সরাসরি মানুষের সামনে কথা বলতে, নিজের মতামত প্রকাশ করতে এবং নতুন বন্ধু বানাতে ভয় পায়।
এই সামাজিক ভীতি তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে।মোবাইল আসক্তির কারণে শিশুদের মধ্যে মনোযোগের অভাবও দেখা দিচ্ছে। তারা কোনো একটি বিষয়ে বেশি সময় ধরে মনোযোগ দিতে পারে না। পড়ালেখায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং একাগ্রতা কমে যায়। এই সমস্যাগুলো তাদের শিক্ষাজীবনে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় আমাদের সচেতন হতে হবে। তাদের মোবাইল ব্যবহার সীমিত করতে হবে, বাস্তব জীবনের সক্রিয় উৎসাহিত করতে হবে এবং মানসিক সমস্যা দেখা দিলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশই পারে একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে।
পড়াশোনায় অমনোযোগী ও ফলাফল খারাপ হওয়া
আজকের প্রতিযোগিতাময় বিশ্বে শিক্ষার্থীদের জন্য মনোযোগ ও একাগ্রতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মোবাইল ফোনের অত্যধিক ব্যবহার শিক্ষার্থীদের এই মূল্যবান গুণগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। যখন একজন শিক্ষার্থী ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল ফোনে সময় কাটায়, তখন তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমতে থাকে এবং ফলাফল খারাপ হওয়া স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়।মোবাইল ফোনের নোটিফিকেশন এবং বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে আসা বার্তাগুলো শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ভেঙে দেয়। পড়ার টেবিলে বসেও তারা প্রতি কয়েক মিনিট পরপর মোবাইল চেক করতে বাধ্য হয়। এই বিরতিহীন মনোযোগের বিচ্ছিন্নতা তাদের গভীরভাবে চিন্তা করতে শেখায় না এবং কোনো বিষয় বুঝে পড়ার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।
অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়ার নাম করে মোবাইল ব্যবহার করে, যা তাদের ফলাফলকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যায়।মোবাইল গেমস এবং সোশ্যাল মিডিয়ার নেশা শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় কেড়ে নিচ্ছে। যে সময়টা তারা পড়াশোনা কাজে ব্যয় করত, সেই সময় এখন মোবাইলের পিছনে নষ্ট হচ্ছে। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীরাও এই আসক্তির কারণে তাদের প্রকৃত সম্ভাবনা প্রকাশ করতে পারছে না। তারা ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছে না, বাসায় পড়তে বসলে অস্থিরতা কাজ করছে এবং অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে নিয়মিত সমস্যা হচ্ছে।মোবাইলের মাধ্যমে পাওয়া তাৎক্ষণিক স সন্তুষ্টি শিক্ষার্থীদের ধৈর্য্য হ্রাস করছে। তারা দ্রুত কোনো সমস্যার সমাধান চায়, জটিল গাণিতিক সমস্যা নিয়ে চিন্তা করতে চায় না।
এই মানসিকতা তাদের একাডেমিক কর্ম ক্ষমতা কে সরাসরি প্রভাবিত করছে। তারা গভীরভাবে অধ্যায়ন করতে পারছে না গবেষণা কাজ এ আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে এবং সমালোচনামূলক চিন্তা দক্ষতা বিকাশ করতে পারছে না।অনলাইন ক্লাসের সময়ও অনেক ছাত্র মোবাইল ব্যবহার করে অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকে। তারা ক্লাসের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট মিস করে, শিক্ষক এর দেওয়া নির্দেশাব আলী সঠিকভাবে অনুসরণ করুন করতে পারে না। এই ব্যবহার তাদের একাডেমিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ধীরে ধীরে তারা শ্রেণীকক্ষ এ পিছিয়ে পড়ছে এবং খারাপ ফলাফল এর দিকে এগোচ্ছে।মোবাইল আসক্তি শিক্ষার্থীদের মুখস্ত করার ক্ষমতা কেও কমিয়ে দিচ্ছে।
তারা তথ্যকে মনে রাখার চেষ্টা করার বদলে সরাসরি মোবাইলে অনুসন্ধান করুন করে। এই সহজ সমাধান তাদের মস্তিষ্ক এর ব্যায়াম কে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলাফল এ তারা পরীক্ষা এ ভালো সঞ্চালন করতে পারছে না প্রশ্নএর সঠিকভাবে উত্তর দিন লিখতে পারছে না।এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসার জন্য ছাত্র-ছাত্রীকে মোবাইল ব্যবহার এর সময় সীমিত করতে হবে। পড়াশোনার সময়ে মোবাইল কে দূরে রাখতে হবে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ বেশি ফোকাস করতে হবে এবং বাবা মা এবং শিক্ষক এর সাথে সহযোগিতা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজকের ভালো ফলাফল-ই ভবিষ্যতের সফল জীবন এর ভিত্তি তৈরি করে।
সামাজিক দক্ষতা কমে যাওয়া এবং একা থাকার প্রবণতা
আজকের ডিজিটাল যুগে আমাদের সামাজিক জীবন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। আমরা প্রযুক্তির যুগে বাস করলেও আমাদের সামাজিক দক্ষতা ও মানবিক সম্পর্কের গুণগত মান কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একা থাকার প্রবণতা বাড়ছে, যা আমাদের সমাজের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করলেও এটি আমাদের সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে নতুন সমস্যা তৈরি করেছে। আগে মানুষ মুখোমুখি বসে গল্প করত, একসাথে সময় কাটাতো, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিত।
কিন্তু আজকাল মানুষ মোবাইল ফোনে বুঁদ হয়ে থাকে, সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে চায় না, এমনকি পরিবারের সদস্যদের সাথেও কম সময় কাটায়। এই পরিবর্তন আমাদের সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করে দিচ্ছে।সামাজিক দক্ষতা কমে যাওয়ার পেছনে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের অত্যধিক ব্যবহার একটি বড় কারণ। মানুষ এখন সরাসরি কথোপকথনের চেয়ে মেসেজ বা ভিডিও কলের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এর ফলে ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের দক্ষতা কমে যাচ্ছে। অনেকেই এখন চোখে চোখ রেখে কথা বলতে, উপযুক্ত ভাবভঙ্গি ব্যবহার করতে কিংবা সামাজিক পরিস্থিতি সামলাতে অসুবিধা বোধ করে।
একা থাকার এই প্রবণতা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গবেষণায় দেখা যায়, যারা বেশি একা থাকে তাদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বেশি দেখা দেয়।তারা নিজেদের অনুভূতি শেয়ার করার মতো কাউকে পায় না, সমস্যার সময় সাহায্য নেওয়ার মতো কেউ থাকে না। এই একাকিত্ব ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে নানা রকম মানসিক সমস্যা তৈরি করে।তরুণদের মধ্যে এই সমস্যা আরও বেশি দেখা যাচ্ছে। তারা বন্ধুদের সাথে পার্কে খেলার বদলে ঘরে বসে ভিডিও গেম খেলতে পছন্দ করে। স্কুল-কলেজে বন্ধু বানানোর বদলে সোশ্যাল মিডিয়াতে ভার্চুয়াল বন্ধু বানাতে বেশি আগ্রহী। এই প্রবণতা তাদের সামাজিক ভাবে গড়ে উঠতে বাধা দিচ্ছে।তারা বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে শিখছে না, সামাজিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসার জন্য আমাদের সচেতন হতে হবে। আমাদের উচিত প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি বাস্তব সামাজিক সম্পর্কের যত্ন নেওয়া।নিয়মিত বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করা, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া, একসাথে সময় কাটানো - এসব অভ্যাস আমাদের সামাজিক দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করবে। মনে রাখতে হবে, মানুষ সামাজিক জীব। আমাদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য সামাজিক সম্পর্ক ও বন্ধনের কোনো বিকল্প নেই।
পরিবারের বন্ধন শিথিল হওয়া ও সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ায়
আজকের ডিজিটাল যুগে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শারীরিকভাবে কাছাকাছি থাকলেও মানসিক দূরত্ব ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। একটি অদৃশ্য প্রাচীর যেন পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে, যার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল ডিভাইসের অত্যধিক ব্যবহার। আমরা একই ঘরে বসে থেকেও যেন আলাদা পৃথিবীতে বাস করছি।পরিবারের সদস্যরা যখন একসাথে বসে আহার করেন, তখন অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় প্রত্যেকে নিজের নিজের মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত। এই দৃশ্য আজকের অনেক পরিবারের জন্য স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খাবার টেবিলে যে গল্পগুজব, হাসি-তামাশা এবং দিনশেষের আলাপচারিতা হওয়ার কথা, তা এখন লুপ্তপ্রায়। পরিবারের ছোট সদস্যরা তাদের দিনের গল্প শোনায় না, বড়রা তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে না। এই যোগাযোগের অভাবই পরবর্তীতে সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি করে।পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং উৎসবগুলোতেও এখন মোবাইল ফোনের উপস্থিতি লক্ষণীয়। জন্মদিনের পার্টি, বিবাহ বার্ষিকী, কিংবা পূজা-পার্বণের মতো অনুষ্ঠানগুলোতে সবাই ব্যস্ত থাকে সেলফি তোলা, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেয়া এবং লাইক-কমেন্ট নেয়ায়। এসব অনুষ্ঠানের আসল উদ্দেশ্য যা হওয়ার কথা - পরিবারের সদস্যদের সাথে মানসিক বন্ধন সুদৃঢ় করা - তা পিছনে চলে যাচ্ছে।
অভিভাবক এবং সন্তানদের মধ্যকার সম্পর্কেও এই প্রযুক্তি দূরত্ব তৈরি করেছে। অনেক পিতা মাতা ই তাদের সন্তানদের সাথে কথা বলার বদলে তাদের হাতে মোবাইল ধরিয়ে দেন শান্ত থাকার জন্য। আবার সন্তানরা তাদের মানসিক সমস্যা, স্কুলের সমস্যা কিংবা ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা নিয়ে মা বাবা কের সাথে আলোচনা করার বদলে ইন্টারনেটে সমাধান খোঁজে। এই অদৃশ্য প্রাচীর দিনে দিনে আরও শক্ত হয়ে উঠছে।পরিবারের সদস্যরা একসাথে টেলিভিশন দেখলেও এখন প্রত্যেকের নিজস্ব ডিভাইস আছে কেউ ইউটিউব ভিডিও দেখছে, কেউ গেম খেলছে, কেউ সোশ্যাল মিডিয়া চেক করছে। একসাথে কোনো প্রোগ্রাম দেখা এবং তা নিয়ে আলোচনা করার মতো বিষয়গুলো এখন কমই দেখা যায়।
এই যৌথ গুলোর অভাব পারিবারিক বন্ধন দুর্বল করে দিচ্ছে।এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সচেতন হতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু সময় মোবাইল ফোন থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে হবে। রাতের খাবারের টেবিল, পারিবারিক সমাবেশ এবং সপ্তাহে-এ মোবাইল ফোন ব্যবহার সীমিত করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের সাথে প্রয়োজনীয় সময় কাটানো, একসাথে বেড়াতে যাওয়া, গল্প করা এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলো পারিবারিক বন্ধন পূর্ণ গঠনের সাহায্য করতে পারে ।মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করবে, কিন্তু পরিবারের বন্ধনই আমাদের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে।
আচরণগত সমস্যা জেদ বাড়াই
আজকাল অনেক বাবা-মা লক্ষ্য করছেন যে তাদের সন্তানদের আচরণগত সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে জেদ করার প্রবণতা আগের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের পিছনে আমাদের জীবনযাপনের পদ্ধতি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।অতিরিক্ত মোবাইল ফোন এবং ট্যাবলেট ব্যবহার শিশুদের আচরণের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। যখন শিশুরা দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রিনের সামনে কাটায়, তখন তারা একটি ভার্চুয়াল জগতে বাস করতে শুরু করে। এই জগতে তাদের সব ইচ্ছা খুব দ্রুত পূরণ হয়ে যায়। একটি বাটন টিপলেই গেম শুরু হয়, একটি স্পর্শ করলেই নতুন ভিডিও চলে আসে।
এই তাৎক্ষণিক তৃপ্তির অভ্যাস শিশুদের বাস্তব জীবনে ধৈর্য ধারণ করতে শেখায় না। তারা যা চায়, তখনই চায়, দেরি সহ্য করতে পারে না। এখান থেকেই জন্ম নেয় জেদের প্রবণতা।আমরা বাবা-মায়েরা অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে শিশুদের জিদের কাছে মাথা নত করি। শিশু কান্না জুড়লে বা জেদ করলে আমরা তাকে মোবাইল ফোন ধরিয়ে দেই। এটি হয়তো সাময়িকভাবে শিশুকে শান্ত করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি শিশুর আচরণকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যায়। শিশু শিখে যায় যে জেদ করলে বা কান্না করলে তার ইচ্ছা পূরণ হবে। এই শিক্ষা তাকে আরও বেশি জেদি করে তোলে।শিশুদের দৈনন্দিন রুটিনে শারীরিক এবং সৃজনশীল খেলার অভাবও আচরণগত সমস্যা তৈরি করছে। আগে শিশুরা মাঠে খেলাধুলা করত, বন্ধুদের সাথে মিলে বিভিন্ন খেলা খেলত।
এই কাজগুলো শিশুদের মধ্যে সামাজিক দক্ষতা গড়ে তুলত, শেখাত কীভাবে আপস করতে হয়, কীভাবে পালা বদল করে খেলতে হয়। এখন শিশুরা একা একা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তাই তারা এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।টেলিভিশন এবং অনলাইনে ভিডিওতে যে বিষয়বস্তু শিশুরা দেখছে, তাও তাদের আচরণকে প্রভাবিত করছে। অনেক কার্টুন এবং খেলায় আক্রমণাত্মক এবং রূক্ষ আচরণকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখানো হয়। শিশুরা এই আচরণগুলো অনুকরণ করে এবং সেগুলোকে সঠিক মনে করে। বাবা-মা যখন এই আচরণে বাধা দেন, তখন শিশুরা জেদ করে এবং তাদের আচরণ পরিবর্তন করতে চায় না।এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের সচেতন হতে হবে। প্রথমত, শিশুদের স্ক্রিনের সামনে সময় সীমিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তাদের সাথে মানসম্পন্ন সময় কাটাতে হবে, তাদের অনুভূতি বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। তৃতীয়ত, তাদের জন্য সৃজনশীল কাজের ব্যবস্থা করতে হবে - যেমন ছবি আঁকা, গল্প বলা, বাইরের খেলাধুলা ইত্যাদি। যখন শিশু জেদ করবে, তখন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে, তার দাবির কাছে সঙ্গে সঙ্গে নতি স্বীকার করা যাবে না।মনে রাখতে হবে, শিশুরা আমাদেরই আয়না। তারা যা দেখে, তাই শেখে। আমরা যদি নিজেরা ধৈর্য এবং ভালো আচরণ দেখাই, শিশুরাও সেটা শিখবে। শিশুর সুন্দর আচরণ গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের সবার। একটু সচেতনতা এবং সময় দিয়ে আমরা আমাদের শিশুদের মধ্যে ইতিবাচক আচরণ গড়ে তুলতে পারি।
আরো পড়ুনঃ ঝাপসা ছবি কিভাবে স্পষ্ট করা যায়
ভাষা বিকাশে বাধা এবং নতুন শব্দ শেখা কমে যায়
আজকাল অনেক শিশুর ভাষাগত দক্ষতা নিয়ে বাবা-মায়েরা গভীরভাবে চিন্তিত। শিশুরা ঠিক সময়ে কথা বলতে শিখছে না, তাদের শব্দভাণ্ডার অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ছে এবং বাক্য গঠনে নানা রকম সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এই সমস্ত সমস্যার পিছনে মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসের অত্যধিক ব্যবহার একটি প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।শিশুর ভাষা বিকাশের জন্য মানুষের সাথে সরাসরি ও স্বাভাবিক যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি। যখন একটি শিশু তার বাবা-মা কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে নিয়মিত কথা বলে, তখন সে কেবল নতুন শব্দই শেখে না,শেখে সঠিক উচ্চারণ, প্রাণবন্ত ভাবভঙ্গি এবং নিজের মনের ভাব সঠিকভাবে প্রকাশ করার কৌশল।
কিন্তু মোবাইল ফোনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রক্রিয়া এখন বিঘ্নিত হচ্ছে। অনেক শিশু আজকাল বাবা-মায়ের স্নেহময়ী কণ্ঠস্বরের বদলে কার্টুনের বিভিন্ন চরিত্রের কৃত্রিম কণ্ঠস্বর শুনে বড় হচ্ছে, মানুষের জীবন্ত মুখের অভিব্যক্তি দেখার বদলে দেখছে অ্যানিমেশনের বিভিন্ন দৃশ্য।মোবাইল ফোনের অধিক ব্যবহার শিশুদের শব্দভাণ্ডারকে খুবই সংকীর্ণ করে দিচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু বেশি সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তাদের শব্দভাণ্ডার অন্য শিশুদের তুলনায় অনেক কম হয়। এর প্রধান কারণ হলো তারা নতুন নতুন শব্দ শোনার এবং সেই শব্দগুলো প্রয়োগ করার পর্যাপ্ত সুযোগ পায় না। তারা কেবল সেই সীমিত শব্দগুলোর সাথেই পরিচিত হয় যা বিভিন্ন কার্টুন বা ভিডিও গেমসে শোনে।
দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ অনেক শব্দই তাদের অজানা থেকে যায়।যখন শিশুরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, তখন তারা সাধারণত নিষ্ক্রিয় শ্রোতার ভূমিকায় থাকে। তারা কেবল দেখে ও শোনে, নিজে থেকে সক্রিয়ভাবে কথা বলার বা জবাব দেবার খুব কম সুযোগই পায়। এই অবস্থা তাদের ভাষাগত উৎপাদনশীলতা বিকাশে গুরুতর বাধার সৃষ্টি করে। তারা অনেক বিষয় বুঝতে পারলেও সেটি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে না, এই ধরনের সমস্যা আজকাল অনেক শিশুর মধ্যেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে।পড়ার অভ্যাসের অভাবও শিশুর ভাষা বিকাশে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। আগের দিনগুলিতে বাবা-মায়েরা শিশুদের নিয়মিত গল্পের বই পড়ে শোনাতেন, মজার মজার ছড়া বলতেন।
এই সমস্ত কাজগুলো শিশুর ভাষা দক্ষতা বিকাশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।অনেক বাবা-মাই শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন ধরিয়ে দেন, বইয়ের বদলে। এই কারণে শিশুরা সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত ভাষার সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।শিশুর ভাষা বিকাশে খেলাধুলারও বিশেষ গুরুত্ব আছে। আগে শিশুরা বন্ধুদের সাথে মিলে নানা রকম খেলা খেলত, মনের সুখ দুঃখের গল্প করত, নিজেদের মতো করে কল্পনার জগৎ তৈরি করত। এই সমস্ত কাজ ভাষা বিকাশে খুবই সহায়ক ছিল। এখন শিশুরা একা একা মোবাইল ফোন নিয়ে খেলে, তাই তাদের কথোপকথনের দক্ষতা ঠিক মতো গড়ে উঠছে না।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে। শিশুদের সাথে বেশি বেশি করে কথা বলতে হবে, তাদেরকে নানা বিষয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে উৎসাহিত করতে হবে, নিয়মিত গল্পের বই পড়ে শোনাতে হবে। মোবাইল ফোনের ব্যবহার যতটা সম্ভব সীমিত করতে হবে এবং বাস্তব জগতের নানা রকম অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ করে দিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সমৃদ্ধ ভাষা দক্ষতা শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য একান্ত অপরিহার্য। এটি তার ভবিষ্যৎ শিক্ষা, সামাজিকতা এবং কর্মজীবনের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
অনাকাঙ্ক্ষিত কনটেন্ট প্রবেশ ও বিপদজনক জগতে পৌঁছানো
আজকের ডিজিটাল যুগে শিশুদের জন্য ইন্টারনেট একটি বিশাল সম্ভাবনার দরজা খুলে দিলেও এটি অনেক বিপদও ডেকে আনছে। শিশুরা যখন অনলাইনে সময় কাটায়, তখন তারা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এমন অনেক বিষয়ের সম্মুখীন হয় যা তাদের বয়সের জন্য একেবারেই উপযুক্ত নয়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়বস্তু শিশুর মানসিক বিকাশে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে এবং তাদেরকে বিপজ্জনক জগতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।ইন্টারনেটে শিশুরা বিভিন্নভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়বস্তুর সংস্পর্শে আসতে পারে। কখনো এটি ঘটে ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে।
যেখানে একটি সাধারণ ভিডিও দেখতে গিয়ে পরের সুপারিশে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বিষয়বস্তু চলে আসে। কখনো হয় গেমিং প্ল্যাটফর্মে, যেখানে অনলাইন গেম খেলার সময় অন্য খেলোয়াড়দের মাধ্যমে অপ্রত্যাশিত বিষয়বস্তুর সম্মুখীন হয়। আবার কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত মানুষদের মাধ্যমে অযাচিত বার্তা বা ছবি পাওয়ার মাধ্যমে এই সমস্যা তৈরি হয়।এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়বস্তু বিভিন্ন রূপ নিতে পারে। সহিংসতাপূর্ণ ভিডিও, অশ্লীল ছবি, ঘৃণামূলক বক্তব্য, চরমপন্থী মতাদর্শ, কিংবা বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর চ্যালেঞ্জ -এই সমস্ত কিছুই শিশুর কোমল মনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশুরা এই ধরনের বিষয়বস্তু দেখে ভয় পেতে পারে, উদ্বেগে ভুগতে পারে।অথবা ভুলভাবে এই আচরণগুলো অনুকরণ করতে পারে।অনলাইনে শিশুদের বিপদ শুধু বিষয়বস্তু পর্যন্তই সীমিত নয়। তারা বিভিন্নভাবে সাইবার অপরাধীদের সংস্পর্শে আসতে পারে। এই অপরাধীরা শিশুদের আস্থা অর্জন করার চেষ্টা করে, তাদের ব্যক্তিগত তথ্য নেয়, এবং ধীরে ধীরে তাদেরকে বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যায়। অনেক সময় তারা শিশুদের ব্ল্যাকমেইল করারও চেষ্টা করে।অনলাইন গেমিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে শিশুরা সাইবার বুলিংয়েরও শিকার হতে পারে।
অন্য ব্যবহারকারীদের মাধ্যমে তারা হয়রানি, হুমকি, কিংবা অপমানজনক ভাষার সম্মুখীন হতে পারে।এই সমস্যা শিশুর আত্মবিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুতরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।এই সমস্ত বিপদ থেকে শিশুদের রক্ষা করার জন্য অভিভাবকদের সচেতনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের অনলাইন কার্যক্রমের উপর নিয়মিত নজরদারি করতে হবে। প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সফটওয়্যার ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশুদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে এবং তাদেরকে অনলাইন নিরাপত্তার বিষয়ে শিক্ষিত করতে হবে।
শিশুদের বুঝতে হবে যে ইন্টারনেটে তারা যা দেখে, সবই নির্ভরযোগ্য নয়।অপরিচিত মানুষের সাথে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করা, অজানা লিঙ্কে ক্লিক না করা, এবং কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের বার্তা করা -এই মৌলিক নিরাপত্তা নিয়মগুলো শিশুদের শেখানো খুবই জরুরি।বিদ্যালয়েও ডিজিটেল সাক্ষরতার উপর গুরুত্ব আরোপ করা উচিত। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়ে শেখানো এবং তাদেরকে দায়িত্বশীল ডিজিটেল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা বর্তমান সময়ের একটি অপরিহার্য প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি এর ঝুঁকিগুলো সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে।একটি নিরাপদ ডিজিটেল পরিবেশ তৈরি করতে অভিভাবক, শিক্ষক এবং প্রযুক্তি কোম্পানিসহ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন আছে। আমাদের শিশুদেরকে ডিজিটেল জগতের ইতিবাচক দিকগুলোর সাথে সংযুক্ত রাখতে হবে, কিন্তু একই সাথে তাদেরকে এর সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কেও সচেতন করতে হবে।
আরো পড়ুনঃ ঝাপসা ছবি কিভাবে স্পষ্ট করা যায়
শেষ কথাঃ শিশুদের মোবাইল আসক্তির কুফল-সমাধানের পথ ও মুক্তির উপায়
শিশুদের মোবাইল আসক্তির কুফল,আজকের ডিজিটাল যুগে শিশুদের মোবাইল আসক্তি একটি ভয়াবহ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। সঠিক পদক্ষেপ ও সময়মতো সচেতনতা আমাদের শিশুদের এই আসক্তি থেকে মুক্ত করতে পারে।প্রথমেই প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তি। বাবা-মাকে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা শিশুকে মোবাইলের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করবেন। এই ইচ্ছাশক্তি নিয়েই শুরু করতে হবে মুক্তির পথ চলা।দৈনন্দিন রুটিন তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর দিনের প্রতিটি কাজের জন্য সময় ভাগ করে দিন।
পড়াশোনা,খেলাধুলা,বিশ্রাম-প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করুন। মোবাইল ব্যবহারের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা সময় বেঁধে দিন এবং এই নিয়মে অটল থাকুন।শিশুর জন্য বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থা করুন। তাকে নতুন নতুন বই কিনে দিন, রং-তুলি দিয়ে ছবি আঁকা শেখান, বাগান করতে শেখান। সপ্তাহে অন্তত একদিন তাকে বাইরে ঘুরতে নিয়ে যান। পার্কে নিয়ে যান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখান। এতে করে তার মন মোবাইল থেকে সরিয়ে অন্য দিকে নিয়ে যাওয়া সহজ হবে।পরিবারের সবার অংশগ্রহণ এই লড়াইয়ে বিশেষভাবে প্রয়োজন।
সপ্তাহে অন্তত একদিন পরিবারের সবাই মিলে একসাথে সময় কাটান। বোর্ড গেম খেলুন, গল্প করুন, একসাথে রান্না করুন। এই সহজ কাজগুলো পরিবারের বন্ধন মজবুত করবে এবং শিশু মোবাইলের প্রতি তার আসক্তি কমিয়ে ফেলবে।মনে রাখবেন, আপনার সামান্য প্রচেষ্টাই পারে একটি শিশুর জীবন বদলে দিতে। একটি শিশুর নির্মল হাসি, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য আজই হোন সচেতন। আপনার সন্তানকে মোবাইলের স্ক্রিনের আড়াল থেকে বের করে এনে জীবনকে উপভোগ করতে শেখান। কারণ আপনার সন্তানের সুস্থ ভবিষ্যতের চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই নয়।



সফটনড়িতে নীতিমালা ; মেনে ;কমেন্ট করুন ;প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়;
comment url